সিঙ্গাপুর ভ্রমণ
ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ভিসা পাওয়া একটু ঝামেলা। নিজে নিজে করতে গেলে ভিসা পাবো কি পাবো না, তাই এজেন্সির হেল্প নেই। ১০ দিনের মধ্যে ভিসা দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ২২ দিন পর ভিসা দেয়। সিঙ্গাপুরের ই-ভিসা। ফী নেয় চার হাজার টাকা। এয়ার টিকেট নিজে নিজেই কিনে নেই। প্রায় ২৭৭ ডলারের মত লাগে রিটার্ন টিকেট। স্কুট এয়ারলাইন্সে। কিছু দিন আগে টিকেট কিনে রাখলে আরো কম খরচ হওয়ার কথা।
৩১ তারিখ রাত নয়টা ১৫ তে ফ্লাইট ছিল। বাসা থেকে বের হয়েছি সন্ধ্যা ৬টার পর। সময় মত বের হলে উবারও এক মিনিটের মধ্যে চলে আসে। ৭টার মধ্যে এয়ারপোর্ট পৌঁছে যাই। গিয়ে দেখি বোর্ডিং পাস দেওয়া হচ্ছে। বোর্ডিং পাস নিয়ে নেই। টিকেটও দেখানো লাগে নাই। শুধু পাসপোর্টটা এগিয়ে দিলেই বোর্ডিং পাস দিয়ে দেয়। আমি বলেছি সম্ভব হলে উইন্ডো সিট দেওয়ার জন্য। উইন্ডো সিটই দিয়েছে।
ইমিগ্রেশন ফরম পূরণ করে ইমিগ্রেশনের জন্য গেলাম। সব কিছু চেক করতে করতে ইমিগ্রেশন অফিসার বলল স্টিকার ভিসা নিলে ভালো হতো। বলল আপনার ভালোর জন্যই বলছি। আমি বললাম ঠিক আছে। এরপর কোন ভিসা করলে স্টিকার ভিসা নিব।
ইমিগ্রেশন শেষে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম। এরপর দেখি বোর্ডিং এর জন্য ডাকল। গেলাম।
সময় মত বিমান টেকঅফ করল। প্রায় চার ঘণ্টার মত ফ্লাইট। ল্যান্ড করে টার্মিনালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাড়ে চার ঘণ্টার মত লেগে যায়। স্কুট এয়ারলাইন্সে কোন খাবার দেয় না। এক্সট্রা কিনতে হয়। ১৪ ডলার হচ্ছে হচ্ছে সাধারণ একটা মিল। পানিও কিনে খেতে হয়। ৪ ডলার! কোন কিছুই খাইনি। যদিও আমার ব্যাগে চকলেট ছিল। কিন্তু অলসতা করে খাওয়া হয়নি। ঘুমিয়েছি।
১ এ নভেম্বর
লোকাল টাইম সকাল সাড়ে তিনটার দিকে ইমিগ্রেশন এরিয়ায় এলাম। ইমিগ্রেশন ফরম পূরণ করে ইমিগ্রেশন ডেস্কে গেলাম। জিজ্ঞেস করল কত দিন থাকব, রিটার্ণ টিকেট কেটেছি কিনা। এরপর চেক করল। তারপর বলল হোটেল বুকিং করেছি কিনা, তা চেক করল। এরপর এরাইভাল সীল মারল এবং ইমিগ্রেশন ফরমের একটা কপি আমাকে রিটার্ণ দিল।
ইমিগ্রেশন পার হয়ে বের হওয়ার পর দেখলাম ম্যাগডোনান্ড। আমার খিদার কথা মনে পড়ল। খেয়ে নিলাম। এরপর এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে হবে। ট্যাক্সি এক্সপেন্সিভ। আমার প্ল্যান হচ্ছে মেট্রো এবং পাবলিক বাস ব্যবহার করা। এদিক সেদিক খোঁজা খুঁজি করে মেট্রো স্টেশন বের করলাম। এটা হচ্ছে টার্মিনাল দুই এর ডান দিকে। গিয়ে দেখি সব বন্ধ। ঐখানে কয়েকজন দাঁড়িয়ে ছিল। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম মেট্রো কখন চালু হবে। উনি বাংলায় বলল সাড়ে পাঁচটায়। বাংলাদেশী! তখন ৫টা বাজে। আমি ভাবলাম দাঁড়িয়ে না থেকে গিয়ে কফি খেয়ে আসি। স্টারবাক্স দেখে এসেছি টার্মিনাল দুই এর দ্বিতীয় তলায়। সেখানে গিয়ে বসে বসে কফি খেলাম।
মেট্রো ব্যবহার করতে হলে টিকেট লাগবে। টিকেট কাউন্টার বন্ধ। ৮টার আগে খুলবে না। পাশেই ছিল একটা বুথ। ez card এর বুথ। দেখলাম ঐখান থেকে ৩০ ডলারে তিন দিনের জন্য বাস এবং মেট্রো ব্যবহারের কার্ড পাওয়া যাবে। ১০ ডলার এক্সট্রা নিবে। কার্ড ফেরত দিলে ১০ দশ ডলার ফেরত দেওয়া হবে। কার্ড নেওয়া খুবি সিম্পল। ট্যুরিস্ট দের জন্য এক দিন, দুই দিন এবং তিনদিনের অপশন রয়েছে। আমি তিন দিনের কার্ড নিয়ে নিলাম একটা। এরপর আমার ডেবিড কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করার পর কার্ড দিয়ে দিল। তা দিয়ে মেট্রোতে উঠে পড়লাম।
আমার হোটেল হচ্ছে চায়না টাউনে। কিন্তু হোটেলে চেক ইন টাইম হচ্ছে ২টায়। এত সকালে সবই বন্ধ। অন্য কোন প্ল্যানও নেই। এক্সপো নামক স্টেশনে নেমে গেলাম। সেখানের কাছেই ছিল পোর্ট ক্যানিং পার্ক। তখন সম্ভবত ছয়টা। কিছু মানুষ ব্যায়াম করছিল। পুরা পার্ক হেঁটে দেখলাম। আমার নিজেরও ব্যায়াম হয়ে গেলো। পিঠে ব্যাকপ্যাক নিয়ে হাঁটতে কষ্টই হচ্ছিল। পার্কে হেঁটে বের হয়ে পরলাম। মেট্রো স্টেশনে এসে চায়না টাউনে আসার মেট্রোতে উঠে পরলাম। তখনো সব বন্ধ। অল্প কয়েকটা খাবার দোকান ছাড়া। আমি হাঁটতে হাঁটতে হকার সেন্টারে চলে গেলাম। ঐখানে বসে সুগার ক্যান খেলাম। মিক্স ফ্রুট বিক্রি করছিল প্লাস্টিকের মগে করে। একটা নিয়ে নিলাম। এরপর আবার হাঁটা শুরু করলাম। অফিস টাইম। সবাই সুটেড বুটেড হয়ে যে যার গন্তব্যে যাচ্ছে। ট্যুরিস্ট ও রয়েছে অনেক। হাঁটতে হাঁটতে ম্যারিনা এরিয়ায় চলে এলাম। দূর থেকে ম্যারিনা বে স্যান্ডস দেখে যেতে লাগলাম। দেখলাম গার্ডেনও। ম্যারিনা বে স্যান্ডস, সিঙ্গাপুর ফ্লায়য়ার, গার্ডেন সব কাছা কাছি।
ম্যারিনা বে স্যান্ডস এর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সিকিউরিটি জিজ্ঞেস করল কোথায় যাবো। বললাম গার্ডেনে। এরপর আমাকে রাস্তা দেখিয়ে দিল। গার্ডেন এরিয়া অনেক বড়। অনেক সুন্দর করে সব সাজানো। রয়েছে অনেক অনেক ভাস্কোর্য। পুরা এরিয়ায় ঘুরতে কোন টিকেট লাগে না। কিন্তু OCBC স্কাই ওয়েতে উঠতে গেলে ৮ ডলার লাগে। টিকেট কেটে উপরে উঠে গেলাম। উপর থেকে দেখতে অনেক সুন্দর লাগে।
SuperTree
গার্ডেন এরিয়ায় এছাড়া রয়েছে ফ্লাওয়ার ডোম এবং ক্লাউড ফরেস্ট, যে গুলোর জন্য লাগে ৩০ ডলার এক সাথে।
ফ্লাওয়ার ডোম এবং ক্লাউড ফরেস্ট দুইটাই এয়ার কন্ডিশন্ড পুরা এরিয়া। কাঁচের ঘরের ভেতর শত প্রজাতির ফুল অন্য অন্যান্য গাছ। এছাড়া রয়েছে সুন্দর কত গুলো ভাস্কোর্য। ভালোই লাগে। কি সুন্দর ফুলের ঘ্রাণ। মন ভালো করে দেওয়ার মত। ফ্লাওয়ার ডোমে অনেকক্ষণ থেকে বের হলাম। এরপর গেলাম ক্লাউড ফরেস্ট। ঢুকার মুখে রয়েছে বিশাল আর্টিফিশিয়াল ঝর্ণা।
ফ্লাওয়ার ডোমের ভেতর কিছু গাছ
ক্লাউড ফরেস্টেও রয়েছে নানা প্রকারের ফুল গাছ। রয়েছে অনেক ছোট ছোট ঝর্ণা। ক্লাউড ফরেস্ট নামের সাথে মিল রেখে কিছু কিছু যায়গা থেকে ধোয়া উঠে। এত সুন্দর সব ফুল ফুটে রয়েছে, ভালো লাগে দেখতে। ক্লাউড ফরেস্টের উপরে হাঁটার রাস্তা রয়েছে। যা দিয়ে সিঙ্গাপুরের স্কাই ভিউ দেখা যায়।
ক্লাউড ফরেস্টের আর্টিফিশিয়াল ঝর্ণা
ক্লাউড ফরেস্টে – এই অংশটা সামনে থেকে অনেক বেশি সুন্দর।
ফ্লাই ট্র্যাপ – কি ভয়ঙ্কর গাছ। বড় হলে সম্ভবত মানুষকেও খেয়ে ফেলত
ক্লাউড ফরেস্টের ভেতর হাঁটার রাস্তা এবং বাহিরের ভিউ
এসব ঘুরতে ঘুরতে দুইটা বাজল। আমি মেট্রোতে করে ফিরে এলাম চায়ানা টাউনে। চায়না টাউন পয়েন্টে বসে খাবার খেয়ে নিলাম। আমার তখনো সিম কেনা হয়নি। Seven-Eleven সুপারশপ গুলোতে সিম পাওয়া যায়। ট্যুরিস্ট সিম ১২ ডলারে ৭ দিনের জন্য ১০০ জিবি ডেটা, ৫০০ মিনিট লোকাল কল এবং ২০ মিনিট ইন্ট্যারন্যাশনাল কল। দারুণ প্যাকেজ।
সকাল থেকে মেঘলা ছিল আকাশ। বৃষ্টি ছিল না। এখন বৃষ্টি হচ্ছে। ঘুড়ি ঘুড়ি বৃষ্টি। হোস্টেলে এলাম। চেকইন করে যখনই বিছানা দেখলাম, শুয়ে পড়লাম। সারাদিন এত বেশি হেঁটেছি যে দুই পা ব্যথা হয়ে রয়েছে। রাতেও তো ঘুমানো হয়নি ঠিক মত। ঘুম থেকে উঠেছি ১০টার দিকে। আমি যেখানে থাকি, তা থেকে বের হলেই ফুডকোট। হেঁটে হেঁটে দেখলাম কি খাওয়া যায়। হালাল খাবার খোঁজার জন্য একটু হাঁটতে হলো। একটা ফুড কোটে গিয়ে সী ফুডের একটা আইটেম অর্ডার দিলাম। অত বেশি টেস্ট ছিল না তারপরও খেয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।
২ নভেম্বর
দুই তারিখ সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে গেলাম বোটানিক্যাল গার্ডেন। মেট্রোতে করে। মেট্রো স্টেশন থেকে বের হলেই বোটানিক্যাল গার্ডেনের গেট। মোটামুটি বড় সড় এরিয়া। সকাল বেলা দেখলাম সবাই ব্যায়াম করতে। খোলা মাঠে ব্যায়ম করে এবং গার্ডেনের ভেতর দিয়ে রাস্তা গুলোতে মানুষ দোড়াদৌড়ি করে। অনেকে আবার এক সাথে ইয়োগা করে।
বোটানিক্যাল গার্ডেন ও এর ভেতর একটা পাবলিক থিয়েটার
গ্রুপ ইয়োগা
মোটামুটি বড় সড় এরিয়া নিয়েই বোটানিক্যাল গার্ডেন। ভেতরে লেক রয়েছে। অনেক প্রজাতির প্রাণী দেখা যায় এর ভেতর। কাওসার ভাই এসেছে উনার ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে। রাতে কথা হলো উনার সাথে। আমরা এক সাথে ঘুরব। বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে চলে গেলাম উনি যেখানে থাকে, The Glades। আবাসিক এরিয়া। ভেতরে কি সুন্দর একটা সুইমিং পুল রয়েছে। আসলে একটা না, অনেক গুলো। বাচ্চাদের জন্য আলাদা।
কাওয়াসার ভাই, ভাবী, জারা এবং সারা সহ আমরা গেলাম চিড়িয়াখানায়। দুপুরের দিকে গিয়েছি। যাওয়ার পর দেখি বৃষ্টি শুরু। কিছুক্ষণ বৃষ্টি কমার জন্য অপেক্ষা করলাম আমরা। কিন্তু বৃষ্টি কমার কোন লক্ষণ দেখিনি। ঐখানে পলেথিনের জামা পাওয়া যায়। কি নাম বলে ঐটার, জানা নেই। যেটা গায়ে দিয়ে আমরা হাঁটতে লাগলাম।
আমরা টিকেট কাটার সময় ট্রামের টিকেট কেটে নেই। চিড়িয়াখানার ভেতর দিয়ে ঘুরায়। বিভিন্ন স্টপে থামায়। কিছুক্ষণ হেঁটে দেখার পর আমরা ট্রামে উঠে পড়লাম। বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। খুব একটা বড় না চিড়িয়াখানাটি। ২ ঘণ্টার মধ্যেই ঘুরা শেষ হয়ে যায়।
আমরা চিড়িয়াখানা থেকে বের হয়ে ফুডকোর্টে বসে খাওয়া দাওয়া করি। নাইট সাফারির জন্য টিকেট চিড়িয়াখানার টিকেটের সাথে কেটে নেই। নাইট সাফারি চিড়িয়াখানার পাশেই। নাইট সাফারিতে উঠার জন্য অনেকেই দেখি লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরাও লাইনে দাঁড়ালাম। এক সময় উঠে পড়লাম। প্রায় আধা ঘণ্টার একটা রাইড। ট্রামে করে ঘুরায় আস্তে আস্তে। বনের ভেতর দিকে। বিভিন্ন প্রাণী দুই পাশে। বলা যায় ন্যাচারাল পরিবেশে। চিড়িয়াখানা থেকে নাইট সাফারি বেশি ভালো লাগছিল আমার কাছে।
নাইট সাফারি শেষে আমরা যাই Gardens by the Bay তে। রাতে সব কি সুন্দর লাইটিং করা। দেখতে ভালো লাগছিল। কিছুক্ষণ সেখানে থেকে গেলাম Marina Bay Sands Hotel এ। ঐটার রুপটপ থেকে সব কিছু সুন্দর ভাবে দেখা যায়। রুপটপ হচ্ছে ৫৭ তলার উপরে। তার দুইটা অংশ। একটা হচ্ছে বার এরিয়া। আরেকটা সুইমিং পুল। সুইমিং পুল শুধু হোটেলের গেস্টদের জন্য। বার এরিয়া সবার জন্য এক্সেসেবল। যদিও আমাদের সাথে বাচ্চা থাকায় ঐখানে প্রবেশ করতে দেয়নি। আমরা এরপর নিচে নেমে আসি। কাওসার ভাইয়েরা উনাদের হোটেলে যায়। আমি যাই আমার হোস্টেলে।
- Nulled
- Tech
- Job
- Hacking Course
- Art
- Causes
- Crafts
- Dance
- Drinks
- Film
- Fitness
- Food
- Games
- Gardening
- Health
- Home
- Literature
- Music
- Networking
- Other
- Party
- Religion
- Shopping
- Sports
- Theater
- Wellness