Patrocinados

সুন্দরবন ভ্রমণ

0
3

বাংলাদেশের অনেক জায়গায়ই আমার ঘুরা হয়েছে, শুধু মাত্র সুন্দরবন ছাড়া। অনেক দিন থেকেই ইচ্ছে ছিল সুন্দরবন ঘুরব, কিন্তু কোন সুযোগ পাই নি। সুন্দরবন একা একা ঘুরা যায় না। ঘুরতে হলে টিম নিয়ে লঞ্চে করে তারপর ঘুরতে হয়। বাংলাদেশের অন্য যে কোন জায়গায় একা একা ঘুরা যায়, শুধু মাত্র সুন্দরবন ছাড়া। এবার সুযোগ হয়েছে এই অসাধারণ জায়গাটি ঘুরার। আপন ভাই একটা ট্যুরের আয়োজন করেছে সুন্দরবনে। আপন ভাই এর সাথে এর আগেও কয়েকটা ট্যুরে গিয়েছি।

তিনদিন ছুটি থাকায় সহজেই সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে বের হতে পারলাম। ২৮ তারিখ অফিস করে রওনা দিয়েছি আমরা। ঢাকা থেকে আমার সাথে এসেছে সোহান এবং শরীফ ভাই। উনারা দুইজন আমার কলিগ। আমরা এক সাথে P1, বসুন্ধরা গ্রুফে জব করি। গ্রিনলাইন থেকে টিকেট আগেই কিনে রেখেছে শরীফ ভাই। খুলনা আসার জন্য। ২৮ তারিখ সন্ধ্যা ৯টায়। খুলনা থেকে এরপর সবাই একসাথে লঞ্চে করে সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে রওনা দিব। ৯টায় বাস ছাড়ার কথা থাকলেও বাস ছেড়েছে ১১টা ১০ এ। বিজনেস ক্লাসের টিকেট কিনেও এ অবস্থা। ভয়াবহ!

আমরা এসেছি আরিচা হয়ে। ফেরি পারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে কিছুক্ষণ। ঢাকা কুমিল্লা বা চট্রগ্রাম হাইওয়েতে যেমন যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়, এ রুটে সম্ভবত তেমন বিরতি দেওয়া হয় না। আমরা খুলনা পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল ৮টা বেজে গিয়েছে। আমাদের আগেই প্রায় সবাই চলে এসেছিল।

বাস থেকে আমরা নেমে এসেছি জেলে ঘাটে। এখানে এসে লিচু দেখে লিচু কিনেছি। আপন ভাই এর জন্য অপেক্ষা করতে করতে লিচু খেয়েছি। এরপর এখানে একটা দোকানে পরটা খেতে বসার পরই আপন ভাই এসেছে আমাদের লঞ্চে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আপন ভাই বলল লঞ্চে আমাদের জন্য সকালের নাস্তা রয়েছে। তারপর ও আমরা একটা করে পরটা খেয়ে নিলাম। এরপর লঞ্চে উঠলাম। লঞ্চ ঘাট থেকে একটু দূরে ছিল। তাই লঞ্চে উঠার জন্য প্রথমে ট্রলারে উঠতে হয়েছে। ঐ ট্রলারে করে পরে আমরা লঞ্চের কাছে গিয়ে লঞ্চে উঠেছি।

আমাদের সাথে টুরিস্ট ছিল প্রায় ৩০ জনের মত। এর মধ্যে চারজন ছিল ইংল্যান্ড থেকে। ওরা হচ্ছে টিম, লরা, ম্যারি এবং তার মেয়ে জুলিয়েট। দেরি করা আসায় লঞ্চের সামনের দিকের সব গুলো রুম বুকড হয়ে গিয়েছে। আমাদের জন্য পেছনের দিকে দুইটা রুম ছিল। পেছনের দিকে সমস্যা হচ্ছে ইঞ্জিনের শব্দ। একটাতে ব্যাগ রেখে লঞ্চের ছাদে উঠলাম। গিয়ে দেখি প্রায় সবাই ছাদে। লঞ্চের ছাদে অনেক রোদ। রোদ থেকে বাঁচার জন্য কাপড়ের ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। লঞ্চের ছাদে বসার জায়গা ও খাওয়ার জায়গা তৈরি করা হয়েছে।

সকালের খাবার হিসেবে ছিল ব্রেড, জেলি, মধু এবং চা বা কফি। লঞ্চে আমরা সবাই উঠার পর ছেড়ে দিল সুন্দবনের উদ্দেশ্যে। আমরা খাওয়া দাওয়া করে যে যার মত করে চারপাশ দেখতে লাগলাম। ছাদে গরম লাগায় আমি লঞ্চের ক্যাপ্টনের রুমে গিয়ে বসলাম। অনেকক্ষণ দেখে একটা রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলাম । এরপর আবার খাবার দেওয়া হলো। কেক এবং পেঁপে। খেয়ে আবার ঘুমালাম। ঘুম থেকে যখন উঠেছি, তখন দুপুরের খাবারের সময় হয়েছে। ততক্ষণে আমরা সুন্দরবন চলে এসেছি।

দুপরের খাবারে ছিল বড় টেংরা মাছ, সবজি এবং মুরগি। সবাই খাওয়া দাওয়া করে আমরা একটা পয়েন্টে নামলাম। নাম হাড়বাড়িয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র। হাড়বাড়িয়া তে নামার জন্য প্রথমে লঞ্চ থেকে ট্রলারে নামতে হয়েছে এরপর ট্রলারে করে হাড়বাড়িয়া। হাড়বাড়িয়া পর্যটকরা যেন সহজেই হাঁটতে পারে, এ জন্য পুল করে দেয়া হয়েছে। পুলের উপর দিয়ে আমরা হাঁততে লাগলাম।

সুন্দরবন ঘুরতে অনেক সিকিউরিটি মেন্টেইন করতে হয়। অনেক প্রকারের পারমিশন লাগে। এরপর বন বিভাগ থেকে সাথে দুইজন গার্ড দেওয়া হয়। তারপর ঘুরার পারমিশন দেওয়া হয়। আমাদের এসব কিছু আগে থেকেই ম্যানেজ করে রাখা ছিল। বন বিভাগ থেকে আমাদের সাথে দুইজন সিকিউরিটি দেওয়া হয়েছে। উনারা আমাদের সাথে পুরো সময়টাতে থাকবে। আমরা কোথাও গেলে একজন সিকিউরিটি সামনে থাকবে, একজন পেছনে। মাঝখানে আমরা সারি বদ্ধ ভাবে হাঁটব।

এছাড়া সুন্দরবনের প্রায় প্রতিটা পয়েন্টে মানুষ হাঁটার জন্য উঁচু সেতুর মত রাস্তা তৈরি করা রয়েছে। যেন জোয়ারের সময় পানি উঠলেও পর্যটকরা সুন্দর মত বন ঘুরে দেখতে পারে। আবার সুন্দরবনের শ্বাস মূলের ভেতর দিয়ে হাঁটা কষ্টকর। এ জন্য এই সেতুর মত রাস্তা গুলো দিয়ে হাঁটতে সহজ হয়। ভালো ভাবে সব ঘুরে ঘুরে দেখা যায়।

হাড়বাড়িয়াতে নেমেই আমরা হরিণ দেখতে পারলাম। এখানে একটা পুকুর রয়েছে। পুকুরের পানি হচ্ছে মিঠা পানি। মিঠা পানি খেতে বনের প্রাণীরা অনেক দূর থেকে চলে আসে। আমরা হাঁটতে লাগলাম এরপর আরো হরিণ চোখে পড়ল। সামনে একজন সিকিউরিটি, পেছনে একজন সিকিউরিটি। পুকুর পাড়ে এসে বসলাম কিছুক্ষণ। এদিক সেদিক হাঁটলাম। এরপর ট্রলারে করে লঞ্চে ফিরে আসলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। আমরা সন্ধ্যার নাস্তা খেলাম, চা বা কফি খেয়ে সবাই মিলে এক সাথে বসে আড্ডা দিতে লাগলাম। এখানে অনেকেই অনেক জায়গা থেকে এসেছে। কেউ কাউকে আমরা ঠিক মত চিনি না। তাই পরিচয় পর্ব হলো প্রথমে। এরপর কালচারাল প্রোগ্রাম। গান সহ অন্যান্য কিছু যে যার মত করে পারফর্ম করল।

IMG_20160429_145855দূর থেকে হাড়বাড়িয়া

 

IMG_20160429_162907হাড়বাড়িয়াতে একটা মিঠা পানির পুকুর

 

IMG_20160429_163343আমাদের টিমের এক অংশ

 

IMG_20160430_054642সুন্দরবনে সূর্যাস্ত

রাতে লঞ্চের ছাদের দারুণ বাতাস বইছিল। আমি রুমে না ঘুমিয়ে লঞ্চের ছাদে বসার জন্য রাখা সোফার উপর ঘুমিয়ে পড়লাম। দারুণ ঘুম হলো। সকালে উঠতে হবে সাড়ে পাঁচটায়। সকালে আমরা কটকা, জামতলা একটা পয়েন্টে নামব।

সকালে ঘুম থেকে উঠার পরই শুভাষ ভাই উইশ করল। আজ ত্রিশ এ এপ্রিল। আমার জন্ম দিন। এরপর আরো একজন দুইজন উইশ করল।

ফ্রেশ হয়ে চা এবং বিস্কিট খেয়ে আমরা ট্রলারে করে নামলাম কটকাতে। ট্রলার থেকে নামার সময় আমাদের হাতে একটা করে আপেল এবং পানির বোতল দেওয়া হলো। কটকাতে সমুদ্র সৈকত রয়েছে। যেখানে আমরা নেমেছি, সেখান থেকে সৈকতে যেতে প্রায় ৪৫ মিনিটের মত লাগবে। আমরা হাঁটা শুরু করলাম। সকাল সকাল হওয়াতে সূর্য উঠেনি। তাই হাঁটতে সমস্যা হয় নি। কটকাটে এত গুলো হরিণ চোখে পড়ল। একদম কাছ থেকে হরিণ দেখতে পেলাম। অনেক গুলো হরিণ। এক সাথে তারা ঘাস খেতে লাগল। আমাদের দেখেই সজাগ হয়ে গেলো। এবং এক সময় বনের ভেতর ঢুকে গেলো।

IMG_20160430_065818কটকা সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার সময়

 

IMG_20160430_073650সমুদ্র সৈকতে গিয়ে যে যার মত করে খেলাধুলা করছে

সৈকত গিয়ে আমরা কেউ কেউ ফুটবল খেললাম। কেউ কেউ বসে প্রকৃতি দেখলাম। কেউ কেউ হাঁটাহাঁটি করলাম। এরপর ফিরে আসলাম। ফেরার সময় আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি। কিছুক্ষণ হাঁটা হাঁটি করে পথ খুঁজে পেয়ে এরপর আস্তে আস্তে ফিরে আসতে লাগলাম। ততক্ষণে সূর্য নিজের তেজ দেখানো শুরু করল।

যাওয়ার সময় আগের পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক এবং অনেক পানির বোতল দেখতে পেলাম। আমাদের সাথে ইংল্যান্ড থেকে আসা টিম ঐ প্লাস্টিক গুলো কুড়িয়ে নিজের পকেটে রাখল। বোতল গুলো তুলে হাতে নিল। পুরো এলাকায় একটা মাত্র বিন ছিল। বিনটা পড়ে ছিল। বিনের চারপাশে অনেক গুলো বোতল পড়ে ছিল। কারণ হচ্ছে বানররা বিনের সব কিছু ফেলে খাবার খোঁজে, তাই। পরে বিদেশী ওরা বিনকে বসিয়ে সব গুলো বোতল বিনের ভেতর রাখল। ওরা বিনে বোতল রাখা শুরু করলে আমাদের সাথের অন্যারাও হেল্প করা শুরু করে।

সকালেই এত হাঁটা হাঁটি করে আমরা অনেক টায়ার্ড হয়ে পড়লাম। লঞ্চে ফিরে আসলাম সবাই। এপর সকালের খাবার খেয়ে নিলাম। সকালের খাবার হিসেবে ছিল খিঁচুড়ি, ডিম আর বেগুণ ভাজি। খেয়ে আবার আরেকটা পয়েন্টে গেলাম। পাশেরই আরেকটা পয়েন্ট। এটাও কটকা। এখানেও অনেক হরিণ ছিল। পর্যটকরা সহজেই যেন হাঁটতে পারে, তার জন্য পথ করা ছিল। আমরা হেঁটে হেঁটে সব দেখলাম। অনেক আগে ঘটে যাওয়া সিডরে সব ভেঙ্গে চুরে ফেলে গিয়েছিল, তা এখনো রয়েছে। অনেক গাছ ভেঙ্গে পড়ে রয়েছে। আমরা এসব দেখে আবার ফিরে এসেছি লঞ্চে।

IMG_20160430_104526কটকাতে বনের ভেতর তৈরি করা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি

লঞ্চে এসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিলাম। আমাদের সরবত এবং সিঙ্গারা খেতে দিল। আমি কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলাম। ঘুম থেকে উঠে দুপুরের খাবার খেলাম। সবাই এক সাথে। লঞ্চের ছাদে বসে। সবজি, রুই মাছ আর কালো হরিণ [ছাগল] এর মাংস ছিল। খাওয়া দাওয়া করে কথা বলতে বলতে ৪টা বেজে গেলো। আমরা এরপর চলে গেলাম অন্য আরেকটা পয়েন্টে। নাম কচিখালি। কচিখালির এখানে একটা ক্যানেল ছিল। ঐ ক্যানেল ধরে আমরা অনেক ভেতরে গিয়েছি ট্রলারে করে। ভালোই লাগছিল। এরপর কচিখালি নামলাম আমরা। সবচেয়ে বেশি হরিণ দেখেছি এই কচিখালিতে। অনেক বড় হরিণের ঝাঁক।

 

IMG_20160430_161435কচিখালি একটা ক্যানেলে

 

IMG_20160430_162939কচিখালিতে একটা বাগান

 

IMG_20160430_163455লবণাক্ত পানি থেকে পান করার উপযোগী পানি পরিশোধন সিস্টেম

এত হরিণ দেখলাম, অনেক কাছ থেকে। অনেক ভালো লেগেছে। এর আগে নিঝুম দ্বীপ গিয়েছি হরিণ দেখতে। অনেক হেঁটেও হরিণের দেখা পাওয়া কষ্ট কর। দেখলেও অনেক দূর থেকে দেখতে হয়েছে। সুন্দরবন এসে ইচ্ছে মত হরিণ দেখতে পেরেছি।

কচিখালি অনেকক্ষণ হাঁটার পর আবার ফিরে আসলাম লঞ্চে। ততক্ষণে সূর্য ডুবতে শুরু করছে। সুন্দরবনে দ্বিতীয় বারের মত সূর্যাস্ত দেখা। সন্ধ্যার পর নাস্তা করে আমরা যে যার মত করে আড্ডা দিতে লাগলাম।

কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়ার পড় শুরু হলো কালচারাল প্রোগ্রাম। কালচারাল প্রোগ্রামের শুরু হলো আমাকে উইশ করে। সবাই মিলে জন্মদিনের গান গাইলো। সবার গান বন্ধ হওয়ার পর পরই বিদেশী ওরা গান গাওয়া শুরু করল আমাকে উদ্দেশ্য করে। কি যে ভালো লাগছিল, বোঝাতে পারব না।

Buscar
Categorías
Read More
Tech
আপনার পিকচারই হবে আপনার কম্পিউটার এর পাসওয়ার্ড | Techtunes | টেকটিউনস
মোবাইলের মাধ্যমে চ্যাট করার কিছু দারুণ সফটওয়্যার মো. আমিনুল ইসলাম সজীব
By Nettumi 2026-09-26 11:51:21 0 46
Nulled
Xhibiter v1.7.1 - NFT Marketplace HTML Template Free
Xhibiter v1.7.1 – NFT Marketplace HTML Template Free Download. Xhibiter is a Light and Fast...
By Nettumi 2026-09-18 03:42:57 0 24
Tech
স্টুডেন্টদের অনলাইনে শিখতে সাহায্য করার জন্য ১০ টি চমৎকার ওয়েবসাইট | Techtunes | টেকটিউনস
মজিলার নির্বাচিত সাতটি বেস্ট ফায়ারফক্স 3 অ্যাডঅন দুঃসাহসী টিনটিন
By Nettumi 2026-09-25 03:58:39 0 30
Nulled
অবশেষে চীনে অফিশিয়াল অনুমোদন পেয়ে গেল Apple Intelligence! Baidu AI এবং Alibaba Qwen Model নিয়ে কাঁপাবে iOS, iPadOS, macOS এবং visionOS যা পুরো টেক মার্কেটে আগুন লাগিয়ে দিবে! | Techtunes | টেকটিউনস
অ্যাপল মানুষকে ফিরিয়ে নিচ্ছে হাত ঘড়ির যুগে… অসামান্য প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতায়! একটি Apple...
By Nettumi 2026-09-21 05:23:26 0 46
Nulled
Croatia and France football federations troll each other on Twitter before World Cup Final
By Nettumi 2026-09-23 17:28:49 0 37
‎ ‎ ‎
Nettumi https://nettumi.com